মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বিশ্বজুড়ে বেড়েছে কয়লার ব্যবহার

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রবাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লার দিকে ঝুঁকছে অনেক দেশ। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোয় কার্বন নিঃসরণকারী এ জ্বালানির ব্যবহার ও আমদানি ব্যাপক হারে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েক মাসে কয়লাবাহী জাহাজের সংখ্যা ও পরিবহন ব্যয়ও কয়েক বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

বাজার বিশ্লেষক সংস্থা কেপলারের তথ্যানুযায়ী, চলতি মাসে বিশ্বজুড়ে কয়লা আমদানির পরিমাণ ৪ লাখ ৬৪ হাজার টন ছাড়িয়ে যেতে পারে। এটি হবে বিশ্ব ইতিহাসে কয়লা আমদানির তৃতীয় সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড। সাধারণত উত্তর গোলার্ধে শীতকাল শেষ হওয়ার পর এপ্রিল ও মে মাসে কয়লার চাহিদা কমে আসে। কিন্তু এ বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ায় চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে মাঝারি আকারের পণ্যবাহী জাহাজগুলোয় কয়লাই সবচেয়ে বেশি পরিবহন করা হচ্ছে।

মার্কেট ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আরগাস জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মে মাসে কয়লা পরিবহনের ভাড়ার হার গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা রফতানিকারক দেশ। সেখান থেকে কয়লা পরিবহনের ভাড়া গত কয়েক মাসে ৬০-৭৫ শতাংশ বেড়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়া থেকে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে ৪০-৫০ শতাংশ।

এ সংকটের মূলে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলে বাধা। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথটি সংকটে পড়েছে। ফলে যে দেশগুলো আগে কাতার বা উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করত, তারা এখন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প হিসেবে কয়লার ওপর নির্ভর করছে।

গ্রিক জাহাজ কোম্পানি নেভিয়াস পার্টনার্সের প্রধান নির্বাহী অ্যাঞ্জেলিকি ফ্র্যাঙ্গু বলেন, ‘এক টন গ্যাসের অভাব মেটাতে অন্তত দুই টন কয়লা প্রয়োজন হচ্ছে। যে কয়লার কথা বিশ্ব প্রায় ভুলে গিয়েছিল, সেটিই এখন বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।’

এশিয়ার দেশগুলোয় কয়লার চাহিদা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। থাইল্যান্ড তাদের বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াও এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমাতে কয়লা বিদ্যুতের ওপর থেকে সব ধরনের পরিবেশবান্ধব বিধিনিষেধ তুলে নিয়েছে। যুদ্ধের শুরুর কয়েক সপ্তাহেই দক্ষিণ কোরিয়া গত বছরের তুলনায় ৪ গিগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কয়লা থেকে উৎপাদন করেছে। জাপান ও ভিয়েতনামেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক শিপিং অ্যাসোসিয়েশন বিমকোর তথ্যানুযায়ী, এপ্রিলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) কয়লা সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম কয়লা ব্যবহারকারী দেশ চীন নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে এখন অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়লা কিনছে। ইন্দোনেশিয়ার রফতানি নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদেরও বাড়তি দামে কয়লা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের সংকট তৈরি হওয়ায় চীন এখন কয়লা থেকে কেমিক্যাল তৈরির কারখানায় উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে।

বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে কয়লার চাহিদা আরো বাড়বে। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো সাধারণত জুলাই থেকে শীতের জন্য কয়লা মজুদ শুরু করে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সে মজুদ কার্যক্রম আরো আগেভাগেই শুরু হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি সত্ত্বেও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে বিশ্বের অনেক দেশ এখন দূষণকারী এ জ্বালানির দিকেই ফিরতে বাধ্য হচ্ছে।

আরও